আজি বসন্তে – পর্ব ৭

#আজি_বসন্তে (পর্ব ৭)

#সুব্রত_মজুমদার

যে সময়টার কথা বলছি সে সময় মোটরবাইক তো দূরস্থ অধিকাংশ গ্রামেই সাইকেলও দূর্লভ ছিল। সিউড়িতে গিয়ে বাবুদের সাইকেলে চাপা দেখে এসেছিলেন চৌকিদার। আর সে দেখেই তার সাইকেল কেনার ইচ্ছা জাগে। আর ইচ্ছা জাগবেই বা না কেন, জমিজমা আর চাকরির টাকায় ভূষণ চৌকিদারের তখন রমরমা অবস্থা। অর্থ আর সম্পদের বিচারে গাঁয়ের মুখুজ্জেদের পরেই তার স্থান। সুতরাং ইচ্ছা জাগাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

-“পা-গাড়ি একট কিনবই রে গদা। ” বেশ গর্বের সুরে বললেন চৌকিদার।
গদা গাঁয়ের মুখ্যুসুখ্যু লোক পা-গাড়ির নাম শুনে অবাক হয়ে যায় সে। বলে, “সি আবার কি গো চৌকিদার ?”
চৌকিদার হাতের ভঙ্গি করে বোঝায় গদাকে। “সি এক গাড়ি, পা দিয়ে চালাতে হয়। পা লড়ালেই ঝড়ঝড় করে চলে। মজার জিনিস রে। তবে দাম অনেক।”
-“তোমার কাছে আবার দাম ! টাকায় কুমির তুমি।” বলল গদা।

গদার মুখে নিজের প্রশংশা শুনে গর্বে বুকটা ভরে যায়। বাইরে কপট লজ্জা দেখিয়ে বললেন, “বেশি বেশি বলছিস রে। ক’টাকা আর আছে বল।”

     সেমাসেই সাইকেল এল। কিন্তু চালাতে জানে না কেউ। তবে তাতে সমস্যা নেই চৌকিদারের, সিউড়িতে এক উকিলবাবুর কাছে সব জেনে নিয়েছেন তিনি । খুবই ভজকট ব্যাপার। পা তুলে চাপতে হয় পা-গাড়িতে। তারপর পিডেল নামের একটা যন্তর ঘোরাতে হয়।

             সাইকেল আসতেই যেন মেলা বসে গেল। আশেপাশের গাঁ হতেও লোক আসতে লাগল সাইকেল দেখতে। কেউ এলেই এসে সামনে দাঁড়াত বিলাসীর শাশুড়ি। বলত, "দাঁড়াও তো বাছা, দূরে দাঁড়াও ছুঁয়ে দিও না। ঠাকুর পুজো দিইনাই আখনো।"

        একটা গরুরগাড়িতে চাপিয়ে কাছেরই মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হল সাইকেলখানা। পাছে রোদ লাগে তাই মাথার উপর টোপর দেওয়া হল। সাইকেল দেখে তো পুরোহিত অবাক। সে সময় একমাত্র বিশ্বকর্মা পুজো ছাড়া যন্ত্রপাতির পুজোর প্রচলন ছিল না।

পুরোহিত বললেন,”অনেক খরচা হবে বাপু। এ যে সে পুজো নয় পা-গাড়ি পুজো।”
চৌকিদার বললেন, “সি খরচা আমি করব। কিন্তু আপনি পা-গাড়ি পুজো জানেন ?”
-“খুব জানি। সিউড়ি-রামপুরহাটে নতুন পা-গাড়ি এলেই আমার ডাক পড়ে।”

এ বয়সেই বড় দুর্মুখ হয়েছে বলাই, সে বলল, “কিন্তু আপনাকে ত এ গাঁ ছেড়ে কোথাও যেতে দেখিনাই কাকা।”
বলাইকে দাবড়ে দিয়ে পুরোহিত বললেন, “তু চুপ কর্। সেদিনকার ছেলে….. ”

           সাইকেল ঘুরে এল ঘরে। সামনের পূর্ণিমায় পুজো হবে। চৌকিদারের ঘরের সামনে প্যান্ডেল করে হবে পুজো। পুরোহিতমশাইও ঘরে গেলেন একরাশ চিন্তা নিয়ে। বলে তো ফেললেন কিন্তু পা-গাড়ির পুজো তার জানা নেই। কিন্তু যে করেই হোক ম্যানেজ করতে হবে। নইলে মান সম্মান থাকবে না।

               ঘরে গিয়ে পুঁথিপত্র খুঁজতে লাগলেন পুরোহিতমশাই। এ পুজোর বিধান কোথাও নেই। অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলেন যে 'ইকিড় মিকিড়' করে যে পুঁথিটা পাবেন সেটা দেখেই পুজো হবে। গুনতে লাগলেন তিনি। শেষমেশ আঙুল পড়ল 'যজুর্বেদীয় বিবাহ পদ্ধতি' র উপর। পুঁথিখানা তুলে নিলেন।

           পা-গাড়ির পুজো দেখে অবাক হল অনেকে। মন্ত্রগুলো যেন খুব চেনা চেনা। অনেকেরই এরকম বোধ হচ্ছিল কিন্তু সাহস করে কিছু বলতে পারছিল না। ঘোষঠাকুমা কিন্তু আর থাকতে পারলেন না। তিনি পুরোহিত মশাইয়ের দিকে আঙুল তুলে বললেন, "এ ঠাকুর, এ বিয়ে না ছেরাদ্দ ?" 

-“আজ্ঞা বিয়ে…” বলেই তড়িঘড়ি চুপ করে গেলেন। গুপ্তকথা ফাঁস হতে বসেছিল। কিন্তু পুরোহিতমশাইও চালাক লোক, তড়িঘড়ি কথা পাল্টে বললেন, “বিয়ে হোক আর ছেরাদ্দ তাতে তোমার কি ? কি বোঝ মন্তরের ? তুমি মরলে সেই আমাকেই যেতে হবে ছেরাদ্দ দিতে। ”

ঘোষঠাকুমা রেগে গিয়ে বললেন,”আমি নয় রে খালভরা তুই যাবি…. খালে যাবি। তোর ছেরাদ্দতে যত তিল লাগে আমি দুব।”

          বিপদ বুঝলেন পুরোহিতমশাই। ঠাকুমাকে আর না ঘাঁটিয়ে নিজের কাজে মন দিলেন তিনি। রীতিমত 'যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব' বলালেন ভূষণকে। শেষমেশ একজোড়া মালা নিয়ে হল মালাবদল। সাইকেল ও চৌকিদার হৃদয়ের বন্ধনে বাঁধা পড়ল। হেসে খুন হল গাঁয়ের লোক।

                 সাইকেলের মতো জিনিসকে তো আর পুজোআচ্চা ধুপধুনো দিয়ে রাখা যায় না, চালানো শিখতে হবে। ছেলেদের সাহায্য নিয়ে সাইকেলে চেপে বসলেন চৌকিদার। ছেলেরা দু'পাশে ধরে ঠেলতে লাগল আর চৌকিদার করতে লাগল প্যাডেল। এ ভারি অদ্ভুত দৃশ্য। দেখতে লোক জমে গেল।

                  দিনতিনেক অভ্যাসের পর চৌকিদার বললেন, " সারগাদার ওই উঁচু হতে ছেড়ে দে আমাকে, আমি নিজে চালাব।"

ছেলেরা বাপের কথামত কাজ করল। বাপ নড়বড় নড়বড় করতে করতে ঢালু বেয়ে চলল সাইকেল নিয়ে। সাইকেল চলছে নিজের গরজে, তার উপর নিয়ন্ত্রণ নেই কারোর। মিনিট খানেকেরও কম সময়ের মধ্যেই চৌকিদার বুঝতে পেরে গেলন তার অসহায়তার কথা। তিনি চিৎকার করতে লাগলেন।
-“বাঁচা… ওরে বলাই, ন্যাপা…. বাঁচা….”

              ছেলেরা ভয়ে এগোতে সাহস করল না। এরকম বেয়াড়া জিনিসের সামনে এসে মরার ইচ্ছা কারোর নেই। পা-গাড়ি খুবই ভয়ঙ্কর জিনিস, বাপ মরছে মরুক, তারা যাবে না। সুতরাং সাইকেল এগিয়ে চলল সামনের দিকে।

       পুরোহিতমশাই স্নান করে কাচা কাপড় পরে চলেছেন শ্রাদ্ধের কাজে । পাশের গ্রাম হতে ডাক এসেছে। মুখে গুনগুন করে মায়ের গান গাইছেন তিনি । 

রাস্তাতেই দেখা হয়ে গেল ঘোষঠাকুমার সঙ্গে। পুরোহিতমশাইকে দেখেই একগাল হেসে ঘোষঠাকুমা বললেন, “চললে কোথায় ?”
-“ছেরাদ্দতে ।”

         পুরোহিতমশাইয়ের উত্তর শুনে ঘোষঠাকুমার মনে পড়ে গেল সাইকেল পুজোর দিনের কথা। তিনি রেগে গিয়ে বললেন, "তোর সঙ্গে কথা বলাই পাপ রে খালভরা। মরগে যা। নিজের ছেরাদ্দ নিজে করগে যা। তুই মর....."

        আর কিছু বলতে পারলেন না ঘোষঠাকুমা। কি যেন একটা দেখে চোখ গোল গোল হয়ে গেল। ব্যাপার দেখে পুরোহিতও ঘাবড়ে গেল। এ তো হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ। না না এ স্ট্রোক।

হাতের ঘটি হতে জল নিয়ে কিছুটা ছিটিয়ে দিলেন ঘোষঠাকুমার মুখে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হল না। বরং কি যেন একটা সড়সড় করে এসে ধাক্কা মারল ঘোষঠাকুমাকে। উল্টে পড়লেন ঘোষঠাকুমা। একদম পুরোহিতের উপর। চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে এল পুরোহিতমশাইয়ের।

অজ্ঞান হওয়ার আগে দেখতে পেলেন একজোড়া পরিচিত চোখ। চৌকিদার।

চৌকিদারের ছেলেরা এসে দেখল তাদের বাবা পড়ে রয়েছে ঘোষঠাকুমার উপর। আর তাদের নিচে পুরোহিতমশাই। কারোর জ্ঞান নেই। পা-গাড়িটা পড়ে রয়েছে হাতদশেক দূরে।
চলবে…

PicsArt_03-31-10.46.32.jpg

Subrata Majumdar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top